ডিসেম্বর ২৬, ১৯৯১ মস্কোর ক্রেমলিন প্রধান সরকারি ভবব থেকে নামিয়ে ফেলা হয় পতাকা, কিন্তু দু দিন আগেই ইতালির রেজ্জো এমিলিয়া শহরে সেই ঐতিহাসিক দাবা টুর্ণামেন্টটি শুরু হয়েছিল, দশজন চেস প্লেয়ার একটি দাবা টুর্ণামেন্টের জন্যে একত্র হয়েছেন, নয় জনই ছিলেন, সোভিয়েত সিটিজেনস, ইতালিতে যখন দাবা টুর্ণামেন্টটা শেষ হচ্ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নেরও পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, এবং আশ্চর্য হওয়ার মতো কথা কি বলবো?
এবং সেই টুর্ণামেন্টের বিজয়ী ওই নয় সোভিয়েত চেস প্লেয়ারদের মধ্যে কেউই নন, বরং বিজয়ী হবেন ভারত থেকে আসা বাইশ বছর বয়সী একজন যুবা তরুণ

১৯৮৫ সালে
ক্যাসপারভ কারপভকে হারিয়ে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হলেন, নেতৃত্বের পরিবর্তন হচ্ছে, এক যুগের অবসান হয়ে অন্য যুগের সূচনা, কিন্তু কারপভ এখনো বিদায় নেননি, নেক্সট ছয় বছর তারা খেলেছেন এবং খেলেছেন, ১৯৯১ সাল আসতে আসতে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে ১৬০ টি গেম খেলে ফেলেছেন, দুইটি জায়ান্ট, দুজনই সোভিয়েত, দুজনই অপ্রতিরোধ্য, আর বাকি সবাই? তারা তাদের স্পর্শও করতে পারেনি, যে জেনারেশন কারপভ এবং ক্যাসপারভের পরে এসেছিল তারা ব্রেক থ্রু করতে পারেনি, অবশ্যই তারা স্ট্রং ছিল, কিন্তু যথেষ্ট স্ট্রং ছিল না, অতঃপর নতুন জেনারেশন এলো,
এবং আগের জেনারেশনের মতো, তাদের ভাবটা ছিল এরকম যেন তারা ক্যাসপারভ এবং কারপভকে ভয় পাচ্ছিল না,
দ্যি স্ট্রংগেস্ট টুর্ণামেন্ট এভার
রেজ্জো এমিলিয়া, একটি মোটামুটি বিশাল জনসংখ্যার শহর, শহরটি এক ধরনের চিজের জন্যে এবং চেস টুর্ণামেন্ট হোস্ট করার জন্যে বিখ্যাত, দশকের পর দশক ধরে একজন গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান নাম এনরিকো পাওলোর মাধ্যমে অর্গানাইজড হচ্ছিল, তাকে ইটালিয়ান চেসের গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান বলা হয়, তার স্পন্সর ছিল ডক্টর এলিয়ো মানডুচ্চি,
সাল ১৯৯১তে মানডুচ্চি খুব অদ্ভুত কিছু একটা করতে চাচ্ছিলো, হিস্টোরির স্ট্রংগেস্ট টুর্ণামেন্ট আয়োজন করা, সুতরাং তিনি তার টুর্ণামেন্টের জন্যে বিশ্বের টপ টেন চেস প্লেয়ারদের আমন্ত্রণ জানান, এই তালিকার মধ্যে ন জনই ছিলেন সোভিয়েত, এরপর একজন ছিলেন যার নাম বিশ্বনানন্থ আনন্দ, একমাত্র আউটসাইডার,
এখানে আমরা এখন থেকে ভিশি আনন্দ বলে সম্বোধন করবো,
তার বয়স যখন মাত্র ছয়, তার ফ্যামিলি ম্যানিলাতে চলে যায়, তার বাবা ফিলিপাইন ন্যাশনাল রেলওয়েস এর জন্যে চাকরি করতেন, যেখানে অন্যান্য শিশুরা বাহিরে খেলাধূলা করতো, ভিশি খেলতেন দাবা, তিনি ফাস্ট ছিলেন, ইনসেনলি ফাস্ট ছিলেন, তারা তাকে ডাকতে লাগল লাইটনিং কিড নামে. ১৯৮৮ সালে তিনি ভারতের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার হন, এবং ১৯৯১ সাল আসতে আসতে আনন্দ দাবা বিশ্বে নয়েজ ˆতরি করতে লাগলেন, টুর্ণামেন্ট জেতা, স্ট্রংগেস্ট প্লেয়ারদের বিট করা, কিন্তু সোভিয়েত স্টাবলিশমেন্ট তাকে এখনো বা কখনোই সিরিয়াসলি নেননি, তারা তাকে এক নাম দিলো এবং সেই নামেই ডাকতে লাগলো- কফি হাউজ প্লেয়ার,
এটি ছিল একটা ইনসাল্ট, কফি হাউজ প্লেয়ার মানে হচ্ছে- এমন কোন ব্যক্তি যিনি তার গেম নিয়ে এতটা সিরিয়াস নন বা প্রোফেশনাল নন, অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবেন না, আনন্দের ব্যাপারে ক্যাসপারভ বলেছিলেন
যে কোন ম্যাচে তাকে ভিন্ন ভিন্ন ওপেনিংয়ের মাধ্যমে ট্র্যাপ করে দেয়া সম্ভব, কঠিন কিছু না,
রাশিয়ান জায়ান্ট একটা ব্যাপারে সম্মত ছিলেন- হ্যা আনন্দ খুবই এন্টারটেইনিং, বাট নট সিরিয়াস!
কিন্তু এই টুর্ণামেন্টের পর তারা তাকে সিরিয়াসলি নিতে শুরু করবে
রাউন্ড ওয়ান
আনন্দ ভালেরি সালভকে বিট করার মাধ্যমে টুর্ণামেন্ট শুরু করেন, কিন্তু এখন সময় এসে গেছে রিয়েল টেস্টের মুখোমুখি হওয়ার, দ্বিতীয় রাউন্ডে ভিশি গ্যারি ক্যাসপারভকে খেললেন, গেমটি শুরু হয়, এবং ক্যাসপারভ পঞ্চম চালে থিওরি মুভ এভোয়েড করে, যার জন্যে তিনি পরিচিত নন, তের চাল আসতে আসতে ক্যাসপারভের কাছে স্পেস ছিল, বিশপ পেয়ার ছিল, এবং তার কিং কুইন সাইডে ক্যাসল করা ছিল, এখন আনন্দ যদি তাকে আরো একটি মুভ খেলার সুযোগ দেয়, কিং বি ওয়ান অথবা নাইট ই ফাইভ, তার পজিশনের অবনতি হবে, কাজেই তিনি নাইট সি ফাইভ খেলেন, যাতে তিনি বিশপ থেকে মুক্তি পেতে পারেন,
১৭ চালে ভিশি গেমটি আরো কমপ্লিকেটেড করার সিদ্ধান্ত নেন, এ টু পনটি নেয়ার মাধ্যমে, ক্যাসপারভের ডিসাইসিভ ইরর আসে ২৫ তম চালে, যেখানে তিনি খেলেন কুইন এফ থ্রি, তার জি থ্রি খেলা উচিত ছিল, এটার পর, গেমটা আয়ত্তে আনা শুধু ভিশির কাছে স্রেফ সময়ের ব্যাপার ছিল,
ভারত থেকে আসা বাইশ বছর বয়সী যুবক মাত্রই ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে দিয়েছেন, অবশ্য একটা জিনিস তাকে সবসময় হান্ট করতে লাগল, তার একটি প্যাটার্ন ছিল, একটি উইকনেস যা তিনি খুব ভালো করেই জানেন,
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন আমি অনেক সময় এক্সপ্লেইন করতে পারি না- আমি কি করতে যাচ্ছি! আমি প্রায় সময়ই কারেক্ট মুভ বের করার চেষ্টা করি, কিন্তু আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন- এখানে প্রসেসটা কি? আমি বোধ হয় ঠিকভাবে বলতে পারব না, হয়তো এভাবেই আমি চেস খেলি, স্পেশালি আমি তিলবার্গে খেলেছি, আমি ক্যাসপারভকে বিট করেছি, কারপভকে বিট করেছি, এভাবে কামস্কি, ক্রচনয়ই, শর্টস, আবার একই ভাবে ক্যাসপারভের কাছে হেরেছি, বাকি সবাইদের কাছেও!
কিছু কিছু পরাজয় তো ছিল জঘন্য,
সাংবাদিক:- এর কারণ কি কি আপনি খুব ইনটুইটিভলি খেলছিলেন বলেই?
ভিশি:- কারণ আমি অস্থির ছিলাম
এবং তৃতীয় রাউন্ডে গুরেভিচের বিরুদ্ধে, এটি আরো একবার হয়ে গেল, গুরেভিচ তাকে বিট করলো, কিন্তু এইবার আনন্দ কলাপস করেননি, পঞ্চম রাউন্ডে তিনি পলুগভস্কিকে হারান, রাউন্ড সিক্স, কারপভের সাথে ড্র, ফাইনাল রাউন্ডে যেতে যেতে তিনজন দাবাড়ুকে পাওয়া গেল, ভিশি আনন্দ, বরিস গেলফেন্ড, গ্যারি ক্যাসপারভ যার ছিল ৫ পয়েন্ট, কারপভ তার হাফ পয়েন্ট অর্থাৎ ৪.৫ পয়েন্ট নিয়ে পিছিয়ে ছিলেন,
সোভিয়েত ইউনিয়ন এগারো দিন ধরে মৃত, পেয়ারিংগুলি ছিল ক্যাসপারভ বনাম খলিফমান, আনন্দ বনাম বিলিয়াভেস্কি, গেলফেন্ড বনাম কারপভ, ব্যস এটুকুই, উইনার টেকস অল!
যদিও বেলিয়াভেস্কি সারা টুর্ণামেন্টে খুব পুওরলি খেলছিলেন- তিনি একজন ফেরোশাস ফাইটার ছিলেন, এবং সবসময় অ্যাটাক করার ধান্দায় থাকতেন,
অন্য বোর্ডে ক্যাসপাভ গ্রাইন্ডিং করছিলেন, তিনি এক ঘন্টা এবং ২০ মিনিটের বিনিময়ে এমন একটি পজিশনে পৌছালেন যা তিনি বাসাতেই অ্যানালাইজ করে এসেছিলেন, এরপর তিনি তার নিজের অ্যানালাইসিস ই ভুলে বসলেন, খলিফমান তাকে ঠিকই কাবু করলেন, গেমটি ড্র হল, ফাইনাল স্ট্যান্ডডিংস গুলি বলছি শুনুন
প্রথম স্থান
ভিশি আনন্দ, সিক্স আউট অফ নাইন,
এরপর আর কিছু জানার দরকার নেই,
একজন ভারতীয় লেদার জ্যাকেটে দাবার সবচেয়ে বড় টুর্ণামেন্টটি জিতে নিলেন, তাও নয়টি সোভিয়েত জায়েন্টের বিরুদ্ধে,
যে গেমটি মোস্ট ইন্ডিয়ানসরাই সিরিয়াসলি কখনো নেননি, তা হুট করেই ফ্রন্ট পেজ নিউজ হয়ে গেল, আনন্দ ১৯৯২ সালে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে পারেননি, তার আরো আট বছর লেগেছিল, কিন্তু ২০০০ সালে, তিনি ফাইনালি জিতে নেন, কিন্তু আনন্দের টাইটেল আসার পর যেটি বেশি জরুরী ছিল তা হচ্ছে- চেস বিকেম গ্লোবল! নরওয়ে থেকে ম্যাগনাস কার্লসেন, চায়না থেকে ডিং লিরেন, অতঃপর ইন্ডিয়া দাবার সুপারপাওয়ারে পরিণত হয়, গুকেশ, প্রাগ, অর্জুন, ইন্ডিয়ার তাই আছে যা একসময়ের জায়ান্ট সোভিয়েতের ছিল, একাডেমিস! ফান্ডিং! এক্সেলেনে&র কালচার,একটি জয়ের বৃত্ত যা পরিপূর্ণ হয়েছে যেখান থেকে তা শুরু হয়েছিল,
Comments
0